ধৈর্য ও নির্ভরতার উপাখ্যান
— এস. এম. এম. সেলিমউল্লাহ
এক পাহাড়ের গুহায় একজন দরবেশ আল্লাহর ধ্যানে নিজেকে সর্বদা নিমগ্ন রাখতেন। দুনিয়ার প্রতি তাঁর কোনো আকর্ষণ ছিল না। জীবিকা অর্জনের জন্য তিনি কোনো কাজও করতেন না। গুহার সম্মুখে একটি আনার (ডালিম) গাছ ছিল। আল্লাহর অসীম কুদরতে প্রতিদিন সেই গাছে তিনটি করে আনার ধরত এবং তিনি সেই তিনটি আনার খেয়েই ক্ষুধা নিবারণ করতেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য কখনো কখনো এমন অলৌকিক উপায়েও রিযিকের ব্যবস্থা করে থাকেন।
পবিত্র কুরআনে হযরত মরিয়ম (আ.)-এর ঘটনায়ও এর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
“অতঃপর তার প্রতিপালক তাকে উত্তমরূপে গ্রহণ করলেন, তাকে সুন্দরভাবে লালন-পালন করলেন এবং তাকে যাকারিয়ার তত্ত্বাবধানে রাখলেন। যখনই যাকারিয়া তার ইবাদতকক্ষে প্রবেশ করতেন, তখনই তার কাছে খাদ্যসামগ্রী দেখতে পেতেন। তিনি বললেন, ‘হে মরিয়ম! এগুলো তুমি কোথা থেকে পেলে?’ তিনি বললেন, ‘এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে।’ নিশ্চয়ই আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিযিক দান করেন।” (সূরা আলে ইমরান : ৩৭)
একদিন আল্লাহ তাআলা তাঁর সেই প্রিয় বান্দাকে পরীক্ষা করার ইচ্ছা করলেন। ফলে আনার গাছে আর ফল ধরল না। প্রথম দিন দরবেশ গাছের কাছে গিয়ে দেখলেন কোনো আনার নেই। তিনি নীরবে ফিরে এসে ধৈর্যের সঙ্গে ইবাদতে মগ্ন হয়ে গেলেন।
দ্বিতীয় দিনও একই অবস্থা। তৃতীয় দিনও কোনো আনার পেলেন না। কিন্তু তিনি ধৈর্য ধারণ করে ইবাদতেই রত রইলেন। তবে ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রণা তাঁকে দুর্বল করে তুলল।
অবশেষে তিনি গুহা থেকে নেমে পাহাড়ের পাদদেশে এলেন। সেখানে এক ইহুদির বাড়িতে গিয়ে নিজের ক্ষুধার কথা জানিয়ে কিছু খাদ্য প্রার্থনা করলেন। ইহুদি তাকে চারটি রুটি দিল।
রুটি নিয়ে ফেরার পথে ইহুদির কুকুরটি তাঁর পথ রোধ করে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল। তিনি একটি রুটি দিলেন। কুকুরটি তা খেয়ে আবার ঘেউ ঘেউ করল। তিনি দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং শেষ পর্যন্ত চতুর্থ রুটিটিও দিয়ে দিলেন। তখন তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন, “কী নিলজ্জ কুকুর! তোর কি সবর-শোকর বলে কিছু নেই?”
আল্লাহ তাআলা তখন দরবেশকে কুকুরের ভাষা বোঝার ক্ষমতা দান করলেন। কুকুরটি বলল, “আমি যদি নিলজ্জ হয়ে থাকি, তবুও আমি তো সেই মালিকের কাছেই বারবার চেয়েছি, যার কাছে প্রথমবার চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনি? যিনি আপনাকে না চাইলেও এত বছর রিযিক দিয়েছেন, তিনি মাত্র তিন দিনের জন্য তা বন্ধ করতেই আপনি তাঁর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা হারিয়ে অন্যের দ্বারস্থ হলেন!”
এই ঘটনাটি আমাদের জন্য গভীর শিক্ষার উৎস। আল্লাহ তাআলা কখনো কখনো তাঁর প্রিয় বান্দাদের ধৈর্য, তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর নির্ভরতা) ও আত্মসমর্পণের পরীক্ষা নেন। প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি, যিনি প্রতিকূল অবস্থায়ও আল্লাহর ওপর অটল আস্থা রাখেন, তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকেন এবং তাঁর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হন না।
হযরত আলী (রা.) ও হযরত হাসান (রা.)-এর শিক্ষামূলক সংলাপ
ধৈর্য, আত্মসংযম, সন্তুষ্টি, মানবতা ও উত্তম চরিত্র ইসলামী জীবনের অন্যতম ভিত্তি। সাহাবায়ে কিরামের জীবনেও এসব গুণের অসংখ্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে হযরত আলী (রা.) ও তাঁর পুত্র হযরত হাসান (রা.)-এর মধ্যে বর্ণিত একটি শিক্ষামূলক সংলাপ বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। এতে মানবজীবনের বিভিন্ন নৈতিক গুণাবলির পরিচয় প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহীভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
হযরত আলী (রা.) তাঁর পুত্র হযরত হাসান (রা.)-কে মানবতা, ভদ্রতা, ধৈর্য, সন্তুষ্টি, সাহস, বুদ্ধিমত্তা, দানশীলতা, ভ্রাতৃত্ব, আভিজাত্য, মূর্খতা, উদাসীনতা, নেতৃত্বসহ বহু বিষয়ে প্রশ্ন করেন। হযরত হাসান (রা.) প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর এমন প্রজ্ঞাপূর্ণ ভাষায় প্রদান করেন, যা যুগে যুগে মুসলিম সমাজে নৈতিক শিক্ষার মূল্যবান সম্পদ হিসেবে সমাদৃত।
এই প্রশ্নোত্তরের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি শিক্ষা হলো—
ধৈর্য হলো ক্রোধ সংবরণ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ।
অভাবমুক্তি হলো আল্লাহ যা দান করেছেন, তা কম হলেও তাতে সন্তুষ্ট থাকা; কেননা প্রকৃত অভাবমুক্তি মনের অভাবমুক্তি।
সাফল্য হলো তাকওয়া, আল্লাহভীতি এবং দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত থাকা।
ভ্রাতৃত্ব হলো সুখে-দুঃখে অঙ্গীকার রক্ষা করা।
বুদ্ধিমত্তা হলো বিনয়ী আচরণ করা এবং সন্দেহজনক বিষয় থেকে নিজেকে দূরে রাখা।
মূর্খতা হলো তুচ্ছ বিষয়ে লিপ্ত হওয়া এবং বিপথগামীদের সঙ্গ গ্রহণ করা।
পরিশেষে হযরত আলী (রা.) তাঁর পুত্রকে উপদেশ দিয়ে বলেন,
“যে ব্যক্তি তোমার চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ, তাকে পিতার মতো সম্মান করো; সমবয়সীকে ভাইয়ের মতো ভালোবাসো; আর যে তোমার চেয়ে ছোট, তাকে সন্তানের মতো স্নেহ করো।”
এ শিক্ষা শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, সমগ্র মানবসমাজের জন্য এক চিরন্তন নৈতিক আদর্শ। ধৈর্য, সন্তুষ্টি, আত্মসংযম, বিনয়, দানশীলতা ও মানবিক আচরণ—এসব গুণই মানুষকে প্রকৃত মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা রাখা এবং হযরত আলী (রা.)-এর এসব অমূল্য নসিহত হৃদয়ে ধারণ করে চরিত্র গঠন করা।



